পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন – মানবতার আলোয় গড়ে ওঠা এক স্বপ্নের ঠিকানা
![]() |
| তুষিত বড়ুয়া কন্যার শুভ জন্মদিনে |
পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন—একটি নাম, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য না বলা গল্প, অশ্রু আর আশার আলো। বর্তমানে এখানে ৬২ জন অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম আবাসিক শিশু বসবাস করছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে নতুন করে আরও ১২ জন শিশু এই পরিবারের অংশ হয়েছে। এখন মোট ৭৪টি কোমল প্রাণ প্রতিদিন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখছে এই আশ্রয়ে। এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি এতিমখানা নয়—এটি এক মানবিক বিদ্যালয়, এক নৈতিক আশ্রয়, এক স্নেহময় পরিবার।
শৃঙ্খলার ভোর, আশার সূচনা
প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠে শিশুরা। ঘুমভাঙা চোখে তারা যখন সারিবদ্ধ হয়ে প্রার্থনায় একত্র হয়, তখন মনে হয়—এরা শুধু শিশু নয়, এরা ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।
৫:৩০ মিনিটে শুরু হয় প্রার্থনা। নীরব প্রভাতে ছোট ছোট কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বুদ্ধের অমৃতময় শান্তির বাণী। সেই মুহূর্ত যেন আকাশকেও নত করে দেয়। প্রার্থনার পর সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে পড়াশোনা। বইয়ের পাতায় মনোযোগী দৃষ্টি, শিক্ষকের কণ্ঠে উৎসাহ—সব মিলিয়ে এক সুন্দর শিক্ষাময় পরিবেশ।
এখানে রয়েছেন ২ জন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, যারা সকাল ও বিকাল নিয়মিত পাঠদান করেন। তারা শুধু পাঠ্যবই নয়, জীবনের পাঠও শেখান—সততা, শৃঙ্খলা ও মানবতার শিক্ষা।
সকাল ৮:৩০টায় সবাই একসাথে ভাত খায়। হয়তো খাবার সাধারণ, কিন্তু সেখানে রয়েছে ভালোবাসার পরশ। একসাথে বসে খাওয়ার আনন্দ তাদের মাঝে গড়ে তোলে ভ্রাতৃত্ববোধ।
বিকালের হাসি, সন্ধ্যার অধ্যবসায়
বিকালে থাকে খেলাধুলা ও বিনোদনের সময়। মাঠে ছুটে বেড়ানো, হাসি-আনন্দে মেতে ওঠা—সেই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, কষ্টের সব স্মৃতি যেন তারা ভুলে গেছে। সন্ধ্যা ৫:৩০ টায় আবার প্রার্থনা। তারপর ৬টায় রাতের খাবার। ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলে নিয়মিত অধ্যয়ন। রাত ১০টায় তারা ঘুমিয়ে পড়ে—স্বপ্ন দেখে এক আলোকিত আগামী দিনের।
মানবতার আলোকবর্তিকা – ভদন্ত সুবর্ণ থের
এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে যিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন, তিনি হলেন পরিচালক ভদন্ত সুবর্ণ থের। তিনি শুধু একজন পরিচালক নন—তিনি এই শিশুদের অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও নীরব ত্যাগের প্রতীক।
ভোরবেলা শিশুদের সঙ্গে প্রার্থনায় দাঁড়িয়ে থাকা, কখনো নিজের হাতে তাদের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ হলে স্নেহভরে পাশে বসে থাকা—এসব দৃশ্য হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
তিনি বিশ্বাস করেন—
“একটি শিশুকে মানুষ করা মানে একটি জাতিকে গড়ে তোলা।”
অনেক সময় দেখা যায়, তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত করছেন যেন প্রত্যেক শিশু সঠিকভাবে খাবার পাচ্ছে। কখনো পড়ার ঘরে গিয়ে তাদের উৎসাহ দিচ্ছেন— “ভালো করে পড়ো, একদিন তোমরাই সমাজের আলো হবে।”
তার পরিচালনায় এখানে শৃঙ্খলা আছে, কিন্তু সেই শৃঙ্খলায় কঠোরতার চেয়ে বেশি রয়েছে মমতা। তিনি জানেন—এই শিশুরা জীবনের কঠিন বাস্তবতা দেখেছে; তাই তাদের প্রয়োজন ভালোবাসা, সাহস আর আত্মবিশ্বাস।
হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা গল্প
এখানে থাকা প্রতিটি শিশুর পেছনে রয়েছে এক একটি কষ্টের ইতিহাস। কেউ বাবা-মা হারিয়েছে , কেউ দারিদ্র্যের নির্মমতায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।
কিন্তু পূর্ণজ্যোতি শিশু সদনে এসে তারা পেয়েছে নতুন পরিবার। পেয়েছে এমন একজন পরিচালক, যিনি তাদের নাম ধরে ডাকেন, তাদের সাফল্যে গর্ব করেন, তাদের দুঃখে কাঁদেন।
রাতের নিস্তব্ধতায় হয়তো কোনো শিশু মায়ের কথা মনে করে অশ্রু ফেলে। তখন ভদন্ত সুবর্ণ থের তাদের মাথায় হাত রেখে বলেন— “তুমি একা নও, আমরা আছি।” এই কথাটুকুই যেন তাদের জীবনে সাহসের সঞ্চার করে।
দায়িত্ব ও স্বপ্নের পথচলা
বর্তমানে ৭৪ জন শিশুর ভরণ-পোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করা একটি বিশাল দায়িত্ব। প্রতিদিনের খাবার, বই, পোশাক, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা—সবকিছুই পরিচালনার জন্য প্রয়োজন আন্তরিক সহায়তা।
তবুও এই প্রতিষ্ঠান থেমে নেই।
কারণ এখানে আছে অদম্য বিশ্বাস—
মানবতার শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি।
ভদন্ত সুবর্ণ থের”র নেতৃত্বে পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন প্রতিটি শিশুকে শুধু বাঁচিয়ে রাখছে না, তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখাচ্ছে।
মানবিকতার আহ্বান
আজ এই শিশুদের হাসির পেছনে আছে অগণিত মানুষের সহযোগিতা ও আর্শিবাদ। কিন্তু দায়িত্ব এখনো অনেক।
আপনার সামান্য সহযোগিতা—
একটি শিশুর বই, একবেলার খাবার, একটি নতুন পোশাক—তার ভবিষ্যৎকে আলোকিত করতে পারে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এই মানবিক যাত্রার অংশ হই।
পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন শুধু একটি আশ্রয় নয়—এটি ভালোবাসা, ত্যাগ ও মানবতার জীবন্ত উদাহরণ।
— পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন, বাইন্যাছোলা, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।
Most Popular
-
ফাইল ছবি- বিশাখা বিশাখা — বৌদ্ধ ইতিহাসে বিশাখা একটি উজ্জ্বল আলো। তিনি কেবল গৌতম বুদ্ধের একজন প্রধান মহিলা উপাসিকা ছিলেন না, বরং স্নেহ, দ...
-
ভদন্ত সুবর্ণ থের, পরিচালক- পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন মানবতার ইতিহাসে কিছু মানুষ আসেন নীরবে, থাকেন নিঃস্বার্থভাবে, আর রেখে যান এমন কিছু অমলিন চি...
-
পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন – মানবতার আলোয় গড়ে ওঠা এক স্বপ্নের ঠিকানা তুষিত বড়ুয়া কন্যার শুভ জন্মদিনে পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন—একটি নাম, যার ভেতরে লুকি...
-
বৌদ্ধ ধর্মের পঞ্চশীল – পঞ্চশীল শুধু নিয়ম নয়, এটি হৃদয়ের প্রতিশ্রুতি । প্রতিটি শীল আমাদের শেখায় কিভাবে জীবনকে স্পর্শ করা যায় দয়া, সততা এবং ...
Search
Popular Posts
আমার কিছু কথা-
“মানবতা হলো সেই আলো, যা অন্ধকার হৃদয়েও পথ দেখায়। একটি সহানুভূতির শব্দ, একটি সাহায্যের হাত, এক ফোঁটা ভালোবাসা— কাউকে বাঁচার নতুন স্বপ্ন দিতে পারে। তাই মানুষ হোন, মানবতার পাশে থাকুন।”
Categories
- অমর একুশে ২০২৬ (1)
- গৌতম বুদ্ধের উপদেশ (2)
- পার্বত্য চট্টগ্রাম সংবাদ (1)
- বিশাখার জীবনী (1)
- মানবতায় নিবেদিত ব্যক্তিগণ (1)
- মানবতার কথা (4)
Social Plugin
Blog Archive
-
▼
2026
(10)
-
▼
February
(10)
- বৌদ্ধ ইতিহাসে শুভ ফাল্গুনী পূর্ণিমার গুরুত্ব ও ফাল...
- পঞ্চশীল বা পঞ্চনীতি বৌদ্ধধর্মে মানবজীবনের চাবিকাটি
- রক্তে রাঙানো একুশ: ভাষা শহীদদের প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধা
- মিগারমাতা বিশাখা: বুদ্ধের প্রধান মহিলা শিষ্য ও দান...
- রাঙ্গামাটির কৃতি সন্তান দীপেন দেওয়ান : নেতৃত্ব, স...
- পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন – মানবতার আলোয় গড়ে ওঠা এক স্ব...
- সমাজে অবহেলিত অনাথ শিশুরাও বাচার অধিকার চাই- ভদন্ত...
- দান তখনই মহৎ হয়, যখন তা প্রচারের জন্য নয়, বরং নী...
- মানবতার আলোকবর্তিকা – সুবর্ণ থের
- মাবতার আলো অন্ধকারে হারানো পথে এক অনন্ত দীপ্তি
-
▼
February
(10)

0 Comments:
Post a Comment