মানবতা হলো নীরবে করা সেই উপকার, যার প্রতিদানে কিছুই চাওয়া হয় না—শুধু একজন মানুষের মুখে হাসি ফুটলেই যার পূর্ণতা।

On February 28, 2026 by Humanity in    No comments

 


বৌদ্ধবিশ্বে ফাল্গুনী পূর্ণিমা—এ যেন শুধুই একটি তিথি নয়, এ এক অশ্রুসজল স্মৃতির দিন, এক মহামিলনের দিন, এক ত্যাগ ও বেদনার পবিত্র আলোকে ভাস্বর চিরন্তন ক্ষণ।

চন্দ্রালোকিত সেই রজনীতে ইতিহাস যেন নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে, আবার আনন্দে ভরে ওঠে মানবহৃদয়। কারণ এই দিন জড়িয়ে আছে গৌতম বুদ্ধ-এর জীবনের অসংখ্য মর্মস্পর্শী অধ্যায়।

আপনি কি ধর্মীয় জ্ঞান বাড়াতে আরো জানতে চান, তাহলে পড়ুন-  মিগারমাতা বিশাখা: বুদ্ধের প্রধান মহিলা শিষ্য ও দানশীল জীবনের সম্পূর্ণ কাহিনী

 

পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন—বিরহের অবসান, আবারও এক নতুন বেদনা

বুদ্ধত্ব লাভের পর সম্যক সম্বুদ্ধ হয়ে যখন তিনি বিশ হাজার ভিক্ষুসঙ্ঘ পরিবৃত হয়ে পৈতৃক নগর কপিলবাস্তু-তে পদার্পণ করলেন, তখন সে কেবল একজন পুত্রের ঘরে ফেরা ছিল না—সে ছিল এক মহাপুরুষের করুণাময় প্রত্যাবর্তন।

যে রাজপ্রাসাদ একদিন তাঁকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল, সেই প্রাসাদ আজ তাঁকে ফিরে পেল—কিন্তু রাজপুত্র সিদ্ধার্থ আর নেই, তিনি এখন জগতের সম্যক সম্বুদ্ধ।

মহারাজ শুদ্ধোদন পুত্রকে দেখে গর্বে, আনন্দে, আবার অদ্ভুত এক শূন্যতায় ভরে উঠলেন। তিনি ভগবানকে রাজপ্রাসাদে ভোজনের আমন্ত্রণ জানালেন—কিন্তু এ ভোজন ছিল পিতার স্নেহ আর বিসর্জনের অশ্রুতে সিক্ত।
এই জন্যই এ দিন “জ্ঞাতি সম্মেলন পূর্ণিমা”—কিন্তু এই সম্মেলনের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল ত্যাগের গভীর ব্যথা।

যশোধরার নীরব অশ্রু

রাজমহিষী যশোধরা—যিনি একদিন স্বামী হারিয়েছিলেন মানবতার কল্যাণে—এই দিন তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রকে পিতার কাছে পাঠালেন। তিনি ‘নরসিংহ’ গাথা আবৃত্তি করে তথাগতের বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণের বর্ণনা করলেন। কিন্তু সেই গাথার প্রতিটি শব্দে ছিল না-বলা কান্না, ছিল এক নারীর নিঃশব্দ তপস্যা। তিনি কিছু চাননি—চেয়েছিলেন কেবল তাঁর সন্তান যেন সত্যের উত্তরাধিকার পায়। এ কেমন ত্যাগ! এ কেমন ভালোবাসা!

পঞ্চশীল কি এবং এর ব্যাখ্যা জানতে এখানে ক্লিক করুন

রাহুলের সত্য উত্তরাধিকার

সপ্তবর্ষীয় রাহুল পিতার কাছে গিয়ে বললেন—“আমাকে আমার উত্তরাধিকার দিন।”

জাগতিক সিংহাসন নয়, স্বর্ণভাণ্ডার নয়—তিনি পেলেন অমর ধর্মধন।
সারিপুত্র থেরের মাধ্যমে তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন।

একটি শিশু সেদিন রাজপুত্র থেকে হলেন ধর্মপুত্র।
পিতার সম্পদ মানে যে মুক্তির পথ—এ শিক্ষা বিশ্বকে দিয়ে গেলেন তিনি।
কিন্তু ভাবুন তো—এক মায়ের হৃদয় তখন কেমন ছিল?

 

মহাপ্রজাপতির সংকল্প—নারীর ইতিহাসে নতুন ভোর

এই পূর্ণিমাতেই মহাপ্রজাপতি গৌতমী গৃহত্যাগের সংকল্প নিলেন। যিনি শৈশব থেকে সিদ্ধার্থকে লালন করেছিলেন, তিনিও সংসার ত্যাগের পথে হাঁটলেন। এ ছিল কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—এ ছিল নারী সংঘ প্রতিষ্ঠার সূচনা, আত্মমুক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যিক অধ্যায়।

মানবতার কাজ সম্পর্কে জানতে ঘুরে আসতে পারেন এই লিংকে- মানবতার আলোকবর্তিকা – সুবর্ণ থের

 

নন্দ ও আনন্দের প্রব্রজ্যা

ভগবানের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা নন্দ-এর প্রব্রজ্যা, যার অপূর্ব কাব্যিক বর্ণনা পাওয়া যায় অশ্বঘোষ-এর সৌন্দরানন্দ-এ—সেই ঘটনাও এই পূর্ণিমার স্মারক। আর ভগবানের অগ্রসেবক আনন্দ সহ বহু শাক্য কুমারের প্রব্রজ্যা—এ যেন এক রাজবংশের ধীরে ধীরে ধর্মবংশে রূপান্তর। রাজমুকুট খুলে তারা ধারণ করলেন চীবর—এ দৃশ্য ভাবলে আজও হৃদয় কেঁপে ওঠে।

 

পিতার অর্হৎ ফল লাভ

এই পবিত্র তিথিতে মহারাজ শুদ্ধোদন সদ্ধর্ম শ্রবণ করে “অর্হৎ ফল” লাভ করেন। এক পিতা, যিনি পুত্রকে হারিয়ে কেঁদেছিলেন, সেই পুত্রেরই বাণীতে চিরশান্তি পেলেন। এ যেন সংসারের সকল বিরহের এক মহামুক্তি।

 

 — ভদন্ত সুবর্ণ থের, অধ্যক্ষ- বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।

 

আমাদের হোমপেজ- এখানে ক্লিক করুন। 

 

0 Comments:

Post a Comment

Most Popular