বৌদ্ধবিশ্বে ফাল্গুনী পূর্ণিমা—এ যেন শুধুই একটি তিথি নয়, এ এক অশ্রুসজল স্মৃতির দিন, এক মহামিলনের দিন, এক ত্যাগ ও বেদনার পবিত্র আলোকে ভাস্বর চিরন্তন ক্ষণ।
চন্দ্রালোকিত সেই রজনীতে ইতিহাস যেন নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে, আবার আনন্দে ভরে ওঠে মানবহৃদয়। কারণ এই দিন জড়িয়ে আছে গৌতম বুদ্ধ-এর জীবনের অসংখ্য মর্মস্পর্শী অধ্যায়।
পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন—বিরহের অবসান, আবারও এক নতুন বেদনা
বুদ্ধত্ব লাভের পর সম্যক সম্বুদ্ধ হয়ে যখন তিনি বিশ হাজার ভিক্ষুসঙ্ঘ পরিবৃত হয়ে পৈতৃক নগর কপিলবাস্তু-তে পদার্পণ করলেন, তখন সে কেবল একজন পুত্রের ঘরে ফেরা ছিল না—সে ছিল এক মহাপুরুষের করুণাময় প্রত্যাবর্তন।
যে রাজপ্রাসাদ একদিন তাঁকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল, সেই প্রাসাদ আজ তাঁকে ফিরে পেল—কিন্তু রাজপুত্র সিদ্ধার্থ আর নেই, তিনি এখন জগতের সম্যক সম্বুদ্ধ।
মহারাজ শুদ্ধোদন পুত্রকে দেখে গর্বে, আনন্দে, আবার অদ্ভুত এক শূন্যতায় ভরে উঠলেন। তিনি ভগবানকে রাজপ্রাসাদে ভোজনের আমন্ত্রণ জানালেন—কিন্তু এ ভোজন ছিল পিতার স্নেহ আর বিসর্জনের অশ্রুতে সিক্ত।
এই জন্যই এ দিন “জ্ঞাতি সম্মেলন পূর্ণিমা”—কিন্তু এই সম্মেলনের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল ত্যাগের গভীর ব্যথা।
যশোধরার নীরব অশ্রু
রাজমহিষী যশোধরা—যিনি একদিন স্বামী হারিয়েছিলেন মানবতার কল্যাণে—এই দিন তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রকে পিতার কাছে পাঠালেন। তিনি ‘নরসিংহ’ গাথা আবৃত্তি করে তথাগতের বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণের বর্ণনা করলেন। কিন্তু সেই গাথার প্রতিটি শব্দে ছিল না-বলা কান্না, ছিল এক নারীর নিঃশব্দ তপস্যা। তিনি কিছু চাননি—চেয়েছিলেন কেবল তাঁর সন্তান যেন সত্যের উত্তরাধিকার পায়। এ কেমন ত্যাগ! এ কেমন ভালোবাসা!
পঞ্চশীল কি এবং এর ব্যাখ্যা জানতে এখানে ক্লিক করুন
রাহুলের সত্য উত্তরাধিকার
সপ্তবর্ষীয় রাহুল পিতার কাছে গিয়ে বললেন—“আমাকে আমার উত্তরাধিকার দিন।”
জাগতিক সিংহাসন নয়, স্বর্ণভাণ্ডার নয়—তিনি পেলেন অমর ধর্মধন।
সারিপুত্র থেরের মাধ্যমে তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন।
একটি শিশু সেদিন রাজপুত্র থেকে হলেন ধর্মপুত্র।
পিতার সম্পদ মানে যে মুক্তির পথ—এ শিক্ষা বিশ্বকে দিয়ে গেলেন তিনি।
কিন্তু ভাবুন তো—এক মায়ের হৃদয় তখন কেমন ছিল?
মহাপ্রজাপতির সংকল্প—নারীর ইতিহাসে নতুন ভোর
এই পূর্ণিমাতেই মহাপ্রজাপতি গৌতমী গৃহত্যাগের সংকল্প নিলেন। যিনি শৈশব থেকে সিদ্ধার্থকে লালন করেছিলেন, তিনিও সংসার ত্যাগের পথে হাঁটলেন। এ ছিল কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—এ ছিল নারী সংঘ প্রতিষ্ঠার সূচনা, আত্মমুক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যিক অধ্যায়।
মানবতার কাজ সম্পর্কে জানতে ঘুরে আসতে পারেন এই লিংকে- মানবতার আলোকবর্তিকা – সুবর্ণ থের
নন্দ ও আনন্দের প্রব্রজ্যা
ভগবানের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা নন্দ-এর প্রব্রজ্যা, যার অপূর্ব কাব্যিক বর্ণনা পাওয়া যায় অশ্বঘোষ-এর সৌন্দরানন্দ-এ—সেই ঘটনাও এই পূর্ণিমার স্মারক। আর ভগবানের অগ্রসেবক আনন্দ সহ বহু শাক্য কুমারের প্রব্রজ্যা—এ যেন এক রাজবংশের ধীরে ধীরে ধর্মবংশে রূপান্তর। রাজমুকুট খুলে তারা ধারণ করলেন চীবর—এ দৃশ্য ভাবলে আজও হৃদয় কেঁপে ওঠে।
পিতার অর্হৎ ফল লাভ
এই পবিত্র তিথিতে মহারাজ শুদ্ধোদন সদ্ধর্ম শ্রবণ করে “অর্হৎ ফল” লাভ করেন। এক পিতা, যিনি পুত্রকে হারিয়ে কেঁদেছিলেন, সেই পুত্রেরই বাণীতে চিরশান্তি পেলেন। এ যেন সংসারের সকল বিরহের এক মহামুক্তি।
— ভদন্ত সুবর্ণ থের, অধ্যক্ষ- বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।
আমাদের হোমপেজ- এখানে ক্লিক করুন।
বৌদ্ধ ধর্মের পঞ্চশীল –
পঞ্চশীল শুধু নিয়ম নয়, এটি হৃদয়ের প্রতিশ্রুতি। প্রতিটি শীল আমাদের শেখায় কিভাবে জীবনকে স্পর্শ করা যায় দয়া, সততা এবং সত্যের আলো দিয়ে।
০১। প্রাণি হত্যা নিষিদ্ধ – অহিংসার গান
০২। চুরি না করা – সততার আলো
০৩। অশ্লীলতা পরিহার – হৃদয়কে পরিচ্ছন্ন রাখা
০৪। মিথ্যা বলা এড়ানো – সত্যের কণ্ঠ
০৫। মাদক ও বিভ্রান্তিকর পদার্থ থেকে বিরত থাকা – সচেতন মন
সারমর্ম–
রক্তে রাঙানো একুশ: ভাষা শহীদদের প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধা
আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়—এটি আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের মায়ের ভাষার মর্যাদার প্রতীক।
১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকা-র রাজপথ রক্তে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের ভাষা শহীদরা। মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আমরা আজ স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলি, লিখি, স্বপ্ন দেখি।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আজকের দিনটি সারা বিশ্বে পালিত হয়— এ আমাদের গর্ব, এ আমাদের অর্জন।
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভালোবাসা আর আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি। ভাষা শহীদদের আত্মদান আমাদের শিখিয়েছে—নিজের শিকড়কে ভালোবাসতে, নিজের ভাষাকে সম্মান করতে।
আজ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সকল ভাষা শহীদকে।
তাদের রক্তে রাঙানো এই বাংলা ভাষা যেন চিরদিন মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ভাষা শহীদদের প্রতি।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? 🌺
— পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন, বাইন্যাছোলা, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।
বিশাখা— বৌদ্ধ ইতিহাসে বিশাখা একটি উজ্জ্বল আলো। তিনি কেবল গৌতম বুদ্ধের একজন প্রধান মহিলা উপাসিকা ছিলেন না, বরং স্নেহ, দয়া এবং অদম্য ভক্তির এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর দানশীলতা, ত্যাগ এবং পরোপকারের উদাহরণ যুগে যুগে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে। বিশাখার জীবন হলো এক ধারাবাহিক প্রেমের কাহিনি—শুধু ব্যক্তিগত ভক্তি নয়, বরং বৌদ্ধ ধর্মের প্রগতি, সামাজিক ন্যায় এবং মানবিক মূল্যবোধের উন্মেষ। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি দেখিয়েছেন, যে ভক্তি যখন সত্যিই নিঃস্বার্থ হয়, তখন তা শুধু আত্মার আলোকিত করে না, বরং চারপাশের পৃথিবীকেও উজ্জ্বল করে তোলে।
সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/অঙ্গুত্তর নিকায়- একক নিপাত/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa
বিশাখার জন্ম ও জনপদের কথা—
বিশাখা জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রাচীন অঙ্গ জনপদের সমৃদ্ধ নগর ভদ্দিয়‑তে। ভদ্দিয় ছিল একটি জমে থাকা শহর, যেখানে উর্বর জমি, নদী ও বাণিজ্য সবই সমৃদ্ধ ছিল। এখানে ধনী পরিবার, ব্যবসায়ী ও শিক্ষিত মানুষরা থাকত। মানুষ ধর্ম এবং নৈতিকতা অনেক গুরুত্ব দিত, তাই নানা মত ও চিন্তার জন্য এখানে সব সময় খোলা পরিবেশ ছিল। পরে এই অঞ্চল শক্তিশালী মগধ রাজ্য‑এর অংশ হয়ে যায়।
এই সমৃদ্ধ ও নৈতিক পরিবেশেই ধনাঞ্জয় শ্রেষ্টী ঘরে জন্ম নেন বিশাখা। তাঁর পিতামহ মেণ্ডক ছিলেন দানশীল ও সম্মানিত ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকেই বিশাখা শিখেছিলেন সৎ জীবন, শিক্ষার গুরুত্ব এবং ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা—এগুলোই তাকে পরিণত করেছিল এক মৈত্রীপরায়ন, করুণাময়, প্রজ্ঞাবান এবং ভক্তিময় নারী হিসেবে।
সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/অঙ্গুত্তর নিকায়- একক নিপাত/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa
বুদ্ধের সঙ্গে প্রথম দেখা—
বুদ্ধ ভদ্দিয় নগরে আগমন করলে তিনি পাঁচশত কুমারীসহ বুদ্ধকে অভ্যর্থনা জানান। বুদ্ধের ধর্মদেশনা শুনে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং স্রোতাপন্ন হন বলে অট্ঠকথায় উল্লেখ আছে। তখন মাত্র বিশাখার বয়স ৭ বছর। এত অল্প বয়সে তাঁর প্রজ্ঞা ও স্থিরতা সকলকে বিস্মিত করেছিল। এই ঘটনা থেকেই তাঁর জীবনের মূল দিক নির্ধারিত হয়—বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের প্রতি অটল শ্রদ্ধা।
সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa
বিবাহ ও “মিগারমাতা” উপাধি—
বিশাখা তখনও ধৈর্য ও প্রজ্ঞার মূর্ত। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি শান্ত, নম্র এবং নিষ্ঠাবান। তার দৃষ্টি, তার হৃদয়ই শেষমেষ তাঁর শ্বশুরকে বুদ্ধের শিষ্য হতে প্রভাবিত করে। মিগার শ্রেষ্টী তখন বলে ওঠেন“তোমাকে আমি মা ভাবি।” সেই ক্ষণেই বিশাখার নাম হয়ে যায় “মিগারমাতা”। শুধু শ্বশুরের জন্য নয়, পুরো ধর্মের জন্য এক মমতাময়ী আস্থার প্রতীক।
এখানেই বোঝা যায়, সত্যিকারের ভক্তি কখনোই অহংকার বা আকাঙ্ক্ষার নয়। বিশাখার ভালোবাসা, ধৈর্য এবং অন্তরের স্থিরতা এক জীবন্ত পাঠ—যে ভক্তি শুধু আত্মাকে নয়, চারপাশের জীবনকেও আলোকিত করে।
সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa
পুব্বারাম বিহার নির্মাণ—
সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/অঙ্গুত্তর নিকায়- একক নিপাত/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa
অষ্ট বর প্রার্থনা—
বিশাখার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো বুদ্ধের নিকট আটটি বর প্রার্থনা। তিনি ব্যক্তিগত সুখের জন্য কিছু চাননি; বরং সংঘের সেবার সুযোগ চেয়েছিলেন। তাঁর প্রার্থনাগুলোর মধ্যে ছিল—
১. বর্ষাবাস বস্ত্র দান
২. আগন্তুক ভিক্ষুদের আহার
৩. গমনকারী ভিক্ষুদের আহার
৪. অসুস্থ ভিক্ষুদের খাদ্য
৫. সেবাকারীদের খাদ্য
৬. ওষুধ প্রদান
৭. প্রতিদিন ভিক্ষুদের পায়েস
৮. ভিক্ষুণীদের স্নানবস্ত্র
বুদ্ধ তাঁর এই প্রার্থনা অনুমোদন করেন এবং এর প্রশংসা করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তাঁর ভক্তি ছিল সেবামূলক ও বাস্তবধর্মী।
সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/অঙ্গুত্তর নিকায়- একক নিপাত/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa
পারিবারিক জীবন—
বিশাখা সংসারজীবন ত্যাগ করেননি। তাঁর দশ পুত্র ও দশ কন্যা ছিল। অসংখ্য নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর পরিবার ছিল বিশাল। তবুও তিনি সংসার ও ধর্ম—উভয় ক্ষেত্রেই সুষম জীবনযাপন করতেন। তিনি দেখিয়েছেন, গৃহস্থ জীবনেও উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থান সম্ভব।
সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa
জীবনের শেষ সময়—
বিশাখা দীর্ঘায়ু লাভ করেন এবং বুদ্ধের শিষ্যত্বে জীবন অতিবাহিত করেন। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি স্রোতাপন্ন (Sotāpanna) অবস্থায় ছিলেন, অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তি ও সত্যের পথে অটল। তাঁর প্রতিটি কাজ—দান, সেবা, ভক্তি—সদা অন্যদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ছিল। মৃত্যুর পর তিনি শুভ গতি লাভ করেন এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ দাত্রী ও ভক্তা নারী হিসেবে স্মরণীয়।
সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা – Visākhā Vatthu / অঙ্গুত্তর নিকায় – Etadagga Vagga।
— ভদন্ত সুবর্ণ থের, অধ্যক্ষ- বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।
![]() |
| মাননীয় এমপি দীপেন দেওয়ান মহোদয় |
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পাহাড়ি জনপদ রাঙ্গামাটি শুধু পর্যটনের জন্য নয়, নেতৃত্বের জন্যও সুপরিচিত। এই অঞ্চল থেকেই উঠে এসেছেন একজন প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ, সংগঠক ও আইনজীবী — দীপেন দেওয়ান। পাহাড়ের মানুষের অধিকার, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী পথচলা আজও অনুপ্রেরণার উৎস।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
দীপেন দেওয়ান জন্মগ্রহণ করেন ৮ জুন ১৯৬৩ সালে, রাঙ্গামাটিতে। তিনি একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুবিমল দেওয়ান জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত ছিলেন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর আদিবাসী বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই দীপেন দেওয়ান রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। চাকমা সম্প্রদায়ভুক্ত এই নেতা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সবসময় সোচ্চার ছিলেন।
শিক্ষা জীবন ও পেশাগত সূচনা
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা রাঙ্গামাটিতেই সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি জমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী ও নেতৃত্বগুণে সমৃদ্ধ। পড়াশোনা শেষে তিনি আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। আদালতে আইনচর্চার পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি রাজনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে পদার্পণ
দীপেন দেওয়ান জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মাধ্যমে। দলীয় রাজনীতিতে তিনি দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, বক্তব্য প্রদানের ক্ষমতা এবং পাহাড়ি অঞ্চলের বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তাঁকে আলাদা করে তোলে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে থেকে তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারের বিষয়ে কাজ করেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়া
রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক আসে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তিনি রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় সংসদ–এর একজন নির্বাচিত সদস্য (এমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি পার্বত্য অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন বলে আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন
দীপেন দেওয়ান বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়–এর পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে তাঁর কাজ পার্বত্য এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শান্তি প্রক্রিয়া জোরদার করা এবং স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তাঁর নেতৃত্বে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে জনগণের বিশ্বাস।
উন্নয়ন ভাবনা ও দর্শন
দীপেন দেওয়ানের রাজনীতির মূল দর্শন হলো — “অধিকার, উন্নয়ন ও সম্প্রীতি।” তিনি বিশ্বাস করেন, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। তিনি পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে শিক্ষা ও যুবসমাজের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ। তিনি মনে করেন, দক্ষ ও শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
একজন দূরদর্শী নেতার প্রতিচ্ছবি
দীপেন দেওয়ান শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। স্থানীয় সমস্যা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা এবং কার্যকর সমাধানের চেষ্টা তাঁকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস ও আস্থা রাখি। পাহাড়ি অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করে যাবেন- সেই সফলতা কামনা করি।
পরিশেষে উপাসক বাবু দীপেন দেওয়ান ও তার পরিবারের প্রতি পূণ্যদান করছি। তারা সকলে সুকী সুখী হোক, নীরোগ দীর্ঘায়ু জীবন লাভ করুক।
পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন – মানবতার আলোয় গড়ে ওঠা এক স্বপ্নের ঠিকানা
![]() |
| তুষিত বড়ুয়া কন্যার শুভ জন্মদিনে |
পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন—একটি নাম, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য না বলা গল্প, অশ্রু আর আশার আলো। বর্তমানে এখানে ৬২ জন অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম আবাসিক শিশু বসবাস করছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে নতুন করে আরও ১২ জন শিশু এই পরিবারের অংশ হয়েছে। এখন মোট ৭৪টি কোমল প্রাণ প্রতিদিন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শিখছে এই আশ্রয়ে। এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি এতিমখানা নয়—এটি এক মানবিক বিদ্যালয়, এক নৈতিক আশ্রয়, এক স্নেহময় পরিবার।
শৃঙ্খলার ভোর, আশার সূচনা
প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে ওঠে শিশুরা। ঘুমভাঙা চোখে তারা যখন সারিবদ্ধ হয়ে প্রার্থনায় একত্র হয়, তখন মনে হয়—এরা শুধু শিশু নয়, এরা ভবিষ্যতের আলোকবর্তিকা।
৫:৩০ মিনিটে শুরু হয় প্রার্থনা। নীরব প্রভাতে ছোট ছোট কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বুদ্ধের অমৃতময় শান্তির বাণী। সেই মুহূর্ত যেন আকাশকেও নত করে দেয়। প্রার্থনার পর সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে পড়াশোনা। বইয়ের পাতায় মনোযোগী দৃষ্টি, শিক্ষকের কণ্ঠে উৎসাহ—সব মিলিয়ে এক সুন্দর শিক্ষাময় পরিবেশ।
এখানে রয়েছেন ২ জন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, যারা সকাল ও বিকাল নিয়মিত পাঠদান করেন। তারা শুধু পাঠ্যবই নয়, জীবনের পাঠও শেখান—সততা, শৃঙ্খলা ও মানবতার শিক্ষা।
সকাল ৮:৩০টায় সবাই একসাথে ভাত খায়। হয়তো খাবার সাধারণ, কিন্তু সেখানে রয়েছে ভালোবাসার পরশ। একসাথে বসে খাওয়ার আনন্দ তাদের মাঝে গড়ে তোলে ভ্রাতৃত্ববোধ।
বিকালের হাসি, সন্ধ্যার অধ্যবসায়
বিকালে থাকে খেলাধুলা ও বিনোদনের সময়। মাঠে ছুটে বেড়ানো, হাসি-আনন্দে মেতে ওঠা—সেই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, কষ্টের সব স্মৃতি যেন তারা ভুলে গেছে। সন্ধ্যা ৫:৩০ টায় আবার প্রার্থনা। তারপর ৬টায় রাতের খাবার। ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলে নিয়মিত অধ্যয়ন। রাত ১০টায় তারা ঘুমিয়ে পড়ে—স্বপ্ন দেখে এক আলোকিত আগামী দিনের।
মানবতার আলোকবর্তিকা – ভদন্ত সুবর্ণ থের
এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে যিনি নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন, তিনি হলেন পরিচালক ভদন্ত সুবর্ণ থের। তিনি শুধু একজন পরিচালক নন—তিনি এই শিশুদের অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও নীরব ত্যাগের প্রতীক।
ভোরবেলা শিশুদের সঙ্গে প্রার্থনায় দাঁড়িয়ে থাকা, কখনো নিজের হাতে তাদের খোঁজ নেওয়া, অসুস্থ হলে স্নেহভরে পাশে বসে থাকা—এসব দৃশ্য হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
তিনি বিশ্বাস করেন—
“একটি শিশুকে মানুষ করা মানে একটি জাতিকে গড়ে তোলা।”
অনেক সময় দেখা যায়, তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিত করছেন যেন প্রত্যেক শিশু সঠিকভাবে খাবার পাচ্ছে। কখনো পড়ার ঘরে গিয়ে তাদের উৎসাহ দিচ্ছেন— “ভালো করে পড়ো, একদিন তোমরাই সমাজের আলো হবে।”
তার পরিচালনায় এখানে শৃঙ্খলা আছে, কিন্তু সেই শৃঙ্খলায় কঠোরতার চেয়ে বেশি রয়েছে মমতা। তিনি জানেন—এই শিশুরা জীবনের কঠিন বাস্তবতা দেখেছে; তাই তাদের প্রয়োজন ভালোবাসা, সাহস আর আত্মবিশ্বাস।
হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা গল্প
এখানে থাকা প্রতিটি শিশুর পেছনে রয়েছে এক একটি কষ্টের ইতিহাস। কেউ বাবা-মা হারিয়েছে , কেউ দারিদ্র্যের নির্মমতায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।
কিন্তু পূর্ণজ্যোতি শিশু সদনে এসে তারা পেয়েছে নতুন পরিবার। পেয়েছে এমন একজন পরিচালক, যিনি তাদের নাম ধরে ডাকেন, তাদের সাফল্যে গর্ব করেন, তাদের দুঃখে কাঁদেন।
রাতের নিস্তব্ধতায় হয়তো কোনো শিশু মায়ের কথা মনে করে অশ্রু ফেলে। তখন ভদন্ত সুবর্ণ থের তাদের মাথায় হাত রেখে বলেন— “তুমি একা নও, আমরা আছি।” এই কথাটুকুই যেন তাদের জীবনে সাহসের সঞ্চার করে।
দায়িত্ব ও স্বপ্নের পথচলা
বর্তমানে ৭৪ জন শিশুর ভরণ-পোষণ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করা একটি বিশাল দায়িত্ব। প্রতিদিনের খাবার, বই, পোশাক, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা—সবকিছুই পরিচালনার জন্য প্রয়োজন আন্তরিক সহায়তা।
তবুও এই প্রতিষ্ঠান থেমে নেই।
কারণ এখানে আছে অদম্য বিশ্বাস—
মানবতার শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি।
ভদন্ত সুবর্ণ থের”র নেতৃত্বে পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন প্রতিটি শিশুকে শুধু বাঁচিয়ে রাখছে না, তাদের স্বপ্ন দেখতে শেখাচ্ছে।
মানবিকতার আহ্বান
আজ এই শিশুদের হাসির পেছনে আছে অগণিত মানুষের সহযোগিতা ও আর্শিবাদ। কিন্তু দায়িত্ব এখনো অনেক।
আপনার সামান্য সহযোগিতা—
একটি শিশুর বই, একবেলার খাবার, একটি নতুন পোশাক—তার ভবিষ্যৎকে আলোকিত করতে পারে।
আসুন, আমরা সবাই মিলে এই মানবিক যাত্রার অংশ হই।
পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন শুধু একটি আশ্রয় নয়—এটি ভালোবাসা, ত্যাগ ও মানবতার জীবন্ত উদাহরণ।
— পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন, বাইন্যাছোলা, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।
সমাজে অবহেলিত অনাথ শিশুরাও বাচার অধিকার চাই- ভদন্ত সুবর্ণ থের
![]() |
| ব্রিজিং জেনারেশনস এর শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ- ২০২৬ |
এই পৃথিবীতে কিছু শিশু জন্ম থেকেই বঞ্চনার ভার বয়ে বেড়ায়। কেউ বাবা-মায়ের স্নেহ হারিয়েছে, কেউ দারিদ্র্যের নির্মম থাবায় শৈশব হারিয়েছে, আবার কেউ সমাজের অবহেলায় স্বপ্ন দেখার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
একজন এতিম বা অসহায় শিশুর চোখের দিকে তাকালে আমরা কেবল দারিদ্র্য দেখি না—আমরা দেখি না-পাওয়া ভালোবাসা, অপুর্ণ নিরাপত্তা, আর এক গভীর নিঃসঙ্গতা। তারা কারও করুণা চায় না; তারা চায় একটু সহানুভূতি, একটু সুযোগ, আর একটু মানুষের মতো বাঁচার অধিকার।
তাদের কষ্ট আমাদের অদৃশ্য নয়
আমরা কি তাদের কান্না শুনি?
আমরা কি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি?
নাকি ব্যস্ত জীবনের অজুহাতে চোখ ফিরিয়ে নিই?
মানুষ মানুষের জন্য—এ শুধু একটি বাক্য নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
আজ যে শিশুটি রাস্তায় ফুল বিক্রি করছে, কাল সে-ই হতে পারে একজন শিক্ষক, ডাক্তার, কিংবা দেশের একজন সৎ নাগরিক—যদি আমরা তাকে সুযোগ দিই।
একটি শিশু যখন হাসে, তখন পুরো পৃথিবী একটু আলোকিত হয়।
তাই আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—
কোনো শিশুর চোখে যেন ক্ষুধার অশ্রু না থাকে,
কোনো শিশুর হৃদয়ে যেন অবহেলার ক্ষত না থাকে,
কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
আজই একটি শিশুর পাশে দাঁড়ান।
কারণ আপনার ছোট্ট সহানুভূতি—কারও পুরো জীবনের আশার আলো হতে পারে।
মানবতা তখনই বেঁচে থাকে, যখন আমরা অসহায় শিশুর হাতটি শক্ত করে ধরে বলি—
“তুমি একা নও, আমরা আছি।”
ভদন্ত সুবর্ণ থের, পরিচালক- পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন। লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।
দান তখনই মহৎ হয়, যখন তা প্রচারের জন্য নয়, বরং নীরব করুণার জন্য করা হয়
![]() |
| শ্রদ্ধাদান দাতা- উপাসিকা সাধনমালা চাকমা |
মানবতার ইতিহাসে কিছু মানুষ আসেন নীরবে, থাকেন নিঃস্বার্থভাবে, আর রেখে যান এমন কিছু অমলিন চিহ্ন—যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে পথ দেখায়। পরম শ্রদ্ধেয় সুবর্ণ থের তেমনই একজন মহামানব, যিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন মানুষের কল্যাণে, অসহায়ের মুখে হাসি ফোটাতে, আর অন্ধকারে আলো জ্বালাতে।
তিনি কখনো নিজের জন্য বাঁচেননি। তাঁর প্রতিটি শ্বাস ছিল মানুষের জন্য, প্রতিটি প্রার্থনা ছিল দুঃখী-অসহায়ের শান্তির জন্য। সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত ও অনাথ শিশুদের দিকে তিনি যে মমতার দৃষ্টি দিয়েছেন—তা শুধু দায়িত্ব নয়, ছিল হৃদয়ের গভীরতম ভালোবাসার প্রকাশ।
যেখানে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়, সেখানে সুবর্ণ থের এগিয়ে গেছেন। যেখানে কেউ দাঁড়াতে চায় না, সেখানে তিনি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন। অনাথ শিশুদের জন্য আশ্রয় গড়ে তোলা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা দেওয়া, রোগীদের পাশে দাঁড়ানো—এসব তাঁর জীবনের নিত্যদিনের সাধনা ছিল।
কত অসহায় মা তাঁর কাছে এসে শান্তির আশ্বাস পেয়েছেন! কত শিশু তাঁর স্নেহস্পর্শে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছে! কত পরিবার তাঁর সহযোগিতায় আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে! তিনি শুধু দান করেননি—তিনি দিয়েছেন ভালোবাসা, সাহস, আর আত্মবিশ্বাস।
সুবর্ণ থের শিখিয়েছেন—মানবতা কোনো বড় কথা নয়, এটি একটি জীবনাচরণ। মানুষের দুঃখকে নিজের দুঃখ মনে করা, অন্যের অশ্রু মুছিয়ে দেওয়া, ক্ষুধার্তকে আহার দেওয়া, নিরাশ মানুষকে আশার আলো দেখানো—এইগুলোই প্রকৃত ধর্ম।
আজ যখন সমাজে স্বার্থপরতা, হিংসা আর বিভাজনের অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, তখন সুবর্ণ থের এর জীবন আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি দেখিয়েছেন, এক জন মানুষও চাইলে সমাজ বদলে দিতে পারে। ভালোবাসা দিয়েই জয় করা যায় সবকিছু।
তাঁর অবদান শুধু একটি প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। যাদের জীবন তিনি স্পর্শ করেছেন—তাঁদের প্রতিটি হাসি, প্রতিটি সফলতা তাঁরই সাধনার ফল।
আমরা হয়তো তাঁর ঋণ কখনো শোধ করতে পারবো না। কিন্তু আমরা তাঁর আদর্শকে ধারণ করতে পারি। তাঁর দেখানো পথে হাঁটতে পারি। তাঁর মতো করে অন্তত একজন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি।
আজ গভীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধায় আমরা স্মরণ করি সুবর্ণ থেরকে—যিনি মানবতার দীপশিখা হয়ে আমাদের হৃদয়ে চিরদিন জ্বলতে থাকবেন।
— পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন (অনাথ আশ্রম), বাইন্যাছোলা, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।
মাবতার আলো অন্ধকারে হারানো পথে এক অনন্ত দীপ্তি
জীবন—কখনও কখনও এক গভীর অন্ধকারের সমুদ্রের মতো। আমরা সেখানে ভেসে যাই, হোঁচট খাই, পথ হারাই। মনে হয়, আর কখনো সূর্যের আলো দেখা হবে না। কিন্তু ঠিক তখনই, এক অদৃশ্য দীপ্তি, এক নরম, শান্ত আলো আমাদের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে—মাবতার আলো।
মাবতার আলো কেবল আলো নয়। এটি বিশ্বাস, আশা, এবং সাহসের এক নিঃশব্দ প্রতীক। এটি আমাদের বলে, “তুমি একা নও। অন্ধকার যত গভীর হোক না কেন, আলোর রেখা ঠিক বের হবে।” জীবনের প্রতিটি ঝড়, প্রতিটি ব্যথা, প্রতিটি হতাশা—এমনকি সেই মুহূর্তগুলোই মাবতার আলোকে আরও উজ্জ্বল করে।
এই আলো আমাদের শেখায়—ভয় কখনও চূড়ান্ত নয়। হতাশা কখনও চিরস্থায়ী নয়। আমাদের ভেতরের শক্তি, আমাদের অন্তরের চুপচাপ দৃঢ়তা, প্রতিটি অন্ধকার মুহূর্তকে আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে। মাবতার আলো সেই শক্তির প্রতীক।
প্রতিটি মানুষের জীবনে এক সময় আসে, যখন সব কিছুর বোঝা একসাথে এসে পড়ে। হৃদয় ভারী, মন ক্লান্ত। মনে হয়, জীবনের কোনো আশা নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে, মাবতার আলো আসে—সাবধান, কোমল, কিন্তু অদম্য। এটি আমাদের শেখায়, কখনো ভেঙে না পড়ে, চলতে চলতে পথ খুঁজতে।
মাবতার আলো আমাদের কেবল নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও আলোর পথ দেখায়। আমরা যখন নিজের অন্ধকার কাটাই, তখনই আমাদের আলো অন্যের জীবনে আলো জ্বালায়। আমরা বুঝি—মানবতার প্রতি বিশ্বাসই সবচেয়ে শক্তিশালী আলোকবর্তিকা। আমরা যদি আলোকিত হতে পারি, তবে আমাদের ছোট ছোট কাজ অন্যকে আলোকিত করে। একটি হাসি, একটি সাহায্যের হাত, একটি কোমল শব্দ—সবই মাবতার আলোকে জীবন্ত রাখে।
এই আলোতে বিশ্বাস রাখা মানে ভয়কে মোকাবেলা করা। হতাশাকে শক্তিতে রূপান্তর করা। অন্ধকার যত গভীর হোক না কেন, নিজের ভেতরের দীপ্তিকে আমরা জাগ্রত রাখতে পারি। মাবতার আলো আমাদের শেখায়—প্রতিটি অন্ধকার মুহূর্ত শুধুই একটি পরীক্ষার সময়। এই পরীক্ষায় আমরা যদি ধৈর্য্য ও ভালোবাসা ধরে রাখি, তবে আলো আমাদের জন্য পথ খুলে দেয়।
মাবতার আলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রত্যেকটি হারানো মানুষ, প্রত্যেকটি দুঃখী হৃদয়, প্রত্যেকটি ক্লান্ত আত্মা, আলোর জন্য আকুল। আমাদের পৃথিবী হয়তো অন্ধকারে ডুবে আছে, কিন্তু প্রতিটি মানুষের ভেতরে সেই আলোকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। আমরা যখন একে অপরের জন্য আলোকপ্রদ হতে পারি, তখনই সত্যিকারের মানবতা জাগে।
এই আলো আমাদের শান্তি দেয়। আমাদের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে। আমাদের মনে করায় যে, জীবনের প্রতিটি যন্ত্রণার পেছনে লুকিয়ে থাকে নতুন সূর্য, নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশার আলো। মাবতার আলো কখনো হঠাৎ আসে না; এটি ধীরে ধীরে আমাদের ভেতর প্রবাহিত হয়, যেমন অন্ধকার রাতের পর ধীরে ধীরে ভোরের আলো আসে।
আমরা যদি এটি উপলব্ধি করতে পারি, তবে প্রতিটি কঠিন মুহূর্তই শিক্ষার একটি অংশ হয়ে ওঠে। আমরা বুঝি—আলোর মূল্য তখনই বোঝা যায় যখন অন্ধকার গভীর হয়। প্রতিটি ব্যথা, প্রতিটি হতাশা আমাদের ভেতরে নতুন শক্তির জন্ম দেয়। এবং সেই শক্তিই মাবতার আলোকে আরও দীপ্তিময় করে তোলে।
মাবতার আলো কেবল এক ধরনের আত্মিক শক্তি নয়। এটি আমাদের জীবনযাপনের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন করে। আমরা হয়তো ভাবি যে, অন্ধকার আমাদের ভেঙে দেবে, আমাদের একা করবে। কিন্তু মাবতার আলো আমাদের দেখায়—অন্ধকারে হারানো পথও আবার পাওয়া যায়, যদি আমরা ধৈর্য্য ধরে আলোর দিকে তাকাই।
এই আলো আমাদের শেখায় ছোট ছোট কাজের শক্তি। একটি সাহায্যের হাত, একটি করুণা, একটি হাসি—এসবই মাবতার আলোকে জীবন্ত রাখে। আমরা যদি নিজের জন্য আলোকিত হই, তবে অন্যের জন্য আলোকিত হওয়া স্বাভাবিক হয়ে যায়। মানবতার প্রতি আমাদের ভালোবাসা, আমাদের উদারতা, আমাদের স্নেহ—সবই মাবতার আলোকে বহন করে।
মাবতার আলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ মূল্যবান। আমরা যদি ভয়, ঘৃণা, বা হতাশায় নিজেকে আটকে রাখি, তবে সেই আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু যদি আমরা বিশ্বাস, আশা, এবং ভালোবাসায় আত্মসমর্পণ করি, তবে মাবতার আলো আমাদের ভেতরে প্রবাহিত হয়, এবং আমাদের জীবনকে আলোকিত করে।
সত্যিই, মাবতার আলো হলো আমাদের হৃদয়ের শক্তি, আমাদের বিশ্বাসের প্রতীক, আমাদের জীবনের চিরন্তন সঙ্গী। এটি আমাদের মনে করায় যে, প্রতিটি অন্ধকার মুহূর্তে, প্রতিটি হতাশার সময়ে, আমরা একা নই। আমাদের ভেতরের দীপ্তি, আমাদের সহমর্মিতা, আমাদের ভালোবাসা—সবই মাবতার আলোকে জাগ্রত রাখে।
সেই কারণে, জীবনের অন্ধকারে হাল ছেড়ে দেবেন না। ভয়কে আলিঙ্গন করুন। হতাশাকে শক্তিতে রূপান্তর করুন। নিজের ভেতরের মাবতার আলোকে জাগ্রত রাখুন। কারণ একদিন, এই আলো আপনার পথকে আলোকিত করবে, আপনার হৃদয়কে শান্ত করবে, এবং আপনার জীবনের অন্ধকারকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে।
Most Popular
-
ফাইল ছবি- বিশাখা বিশাখা — বৌদ্ধ ইতিহাসে বিশাখা একটি উজ্জ্বল আলো। তিনি কেবল গৌতম বুদ্ধের একজন প্রধান মহিলা উপাসিকা ছিলেন না, বরং স্নেহ, দ...
-
ভদন্ত সুবর্ণ থের, পরিচালক- পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন মানবতার ইতিহাসে কিছু মানুষ আসেন নীরবে, থাকেন নিঃস্বার্থভাবে, আর রেখে যান এমন কিছু অমলিন চি...
-
পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন – মানবতার আলোয় গড়ে ওঠা এক স্বপ্নের ঠিকানা তুষিত বড়ুয়া কন্যার শুভ জন্মদিনে পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন—একটি নাম, যার ভেতরে লুকি...
-
বৌদ্ধ ধর্মের পঞ্চশীল – পঞ্চশীল শুধু নিয়ম নয়, এটি হৃদয়ের প্রতিশ্রুতি । প্রতিটি শীল আমাদের শেখায় কিভাবে জীবনকে স্পর্শ করা যায় দয়া, সততা এবং ...
Search
Popular Posts
আমার কিছু কথা-
“মানবতা হলো সেই আলো, যা অন্ধকার হৃদয়েও পথ দেখায়। একটি সহানুভূতির শব্দ, একটি সাহায্যের হাত, এক ফোঁটা ভালোবাসা— কাউকে বাঁচার নতুন স্বপ্ন দিতে পারে। তাই মানুষ হোন, মানবতার পাশে থাকুন।”
Categories
- অমর একুশে ২০২৬ (1)
- গৌতম বুদ্ধের উপদেশ (2)
- পার্বত্য চট্টগ্রাম সংবাদ (1)
- বিশাখার জীবনী (1)
- মানবতায় নিবেদিত ব্যক্তিগণ (1)
- মানবতার কথা (4)
Social Plugin
Blog Archive
-
▼
2026
(10)
-
▼
February
(10)
- বৌদ্ধ ইতিহাসে শুভ ফাল্গুনী পূর্ণিমার গুরুত্ব ও ফাল...
- পঞ্চশীল বা পঞ্চনীতি বৌদ্ধধর্মে মানবজীবনের চাবিকাটি
- রক্তে রাঙানো একুশ: ভাষা শহীদদের প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধা
- মিগারমাতা বিশাখা: বুদ্ধের প্রধান মহিলা শিষ্য ও দান...
- রাঙ্গামাটির কৃতি সন্তান দীপেন দেওয়ান : নেতৃত্ব, স...
- পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন – মানবতার আলোয় গড়ে ওঠা এক স্ব...
- সমাজে অবহেলিত অনাথ শিশুরাও বাচার অধিকার চাই- ভদন্ত...
- দান তখনই মহৎ হয়, যখন তা প্রচারের জন্য নয়, বরং নী...
- মানবতার আলোকবর্তিকা – সুবর্ণ থের
- মাবতার আলো অন্ধকারে হারানো পথে এক অনন্ত দীপ্তি
-
▼
February
(10)


.jpg)















