মানবতা হলো নীরবে করা সেই উপকার, যার প্রতিদানে কিছুই চাওয়া হয় না—শুধু একজন মানুষের মুখে হাসি ফুটলেই যার পূর্ণতা।

On February 28, 2026 by Humanity in    No comments

 


বৌদ্ধবিশ্বে ফাল্গুনী পূর্ণিমা—এ যেন শুধুই একটি তিথি নয়, এ এক অশ্রুসজল স্মৃতির দিন, এক মহামিলনের দিন, এক ত্যাগ ও বেদনার পবিত্র আলোকে ভাস্বর চিরন্তন ক্ষণ।

চন্দ্রালোকিত সেই রজনীতে ইতিহাস যেন নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে, আবার আনন্দে ভরে ওঠে মানবহৃদয়। কারণ এই দিন জড়িয়ে আছে গৌতম বুদ্ধ-এর জীবনের অসংখ্য মর্মস্পর্শী অধ্যায়।

আপনি কি ধর্মীয় জ্ঞান বাড়াতে আরো জানতে চান, তাহলে পড়ুন-  মিগারমাতা বিশাখা: বুদ্ধের প্রধান মহিলা শিষ্য ও দানশীল জীবনের সম্পূর্ণ কাহিনী

 

পিতৃগৃহে প্রত্যাবর্তন—বিরহের অবসান, আবারও এক নতুন বেদনা

বুদ্ধত্ব লাভের পর সম্যক সম্বুদ্ধ হয়ে যখন তিনি বিশ হাজার ভিক্ষুসঙ্ঘ পরিবৃত হয়ে পৈতৃক নগর কপিলবাস্তু-তে পদার্পণ করলেন, তখন সে কেবল একজন পুত্রের ঘরে ফেরা ছিল না—সে ছিল এক মহাপুরুষের করুণাময় প্রত্যাবর্তন।

যে রাজপ্রাসাদ একদিন তাঁকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিল, সেই প্রাসাদ আজ তাঁকে ফিরে পেল—কিন্তু রাজপুত্র সিদ্ধার্থ আর নেই, তিনি এখন জগতের সম্যক সম্বুদ্ধ।

মহারাজ শুদ্ধোদন পুত্রকে দেখে গর্বে, আনন্দে, আবার অদ্ভুত এক শূন্যতায় ভরে উঠলেন। তিনি ভগবানকে রাজপ্রাসাদে ভোজনের আমন্ত্রণ জানালেন—কিন্তু এ ভোজন ছিল পিতার স্নেহ আর বিসর্জনের অশ্রুতে সিক্ত।
এই জন্যই এ দিন “জ্ঞাতি সম্মেলন পূর্ণিমা”—কিন্তু এই সম্মেলনের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল ত্যাগের গভীর ব্যথা।

যশোধরার নীরব অশ্রু

রাজমহিষী যশোধরা—যিনি একদিন স্বামী হারিয়েছিলেন মানবতার কল্যাণে—এই দিন তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্রকে পিতার কাছে পাঠালেন। তিনি ‘নরসিংহ’ গাথা আবৃত্তি করে তথাগতের বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণের বর্ণনা করলেন। কিন্তু সেই গাথার প্রতিটি শব্দে ছিল না-বলা কান্না, ছিল এক নারীর নিঃশব্দ তপস্যা। তিনি কিছু চাননি—চেয়েছিলেন কেবল তাঁর সন্তান যেন সত্যের উত্তরাধিকার পায়। এ কেমন ত্যাগ! এ কেমন ভালোবাসা!

পঞ্চশীল কি এবং এর ব্যাখ্যা জানতে এখানে ক্লিক করুন

রাহুলের সত্য উত্তরাধিকার

সপ্তবর্ষীয় রাহুল পিতার কাছে গিয়ে বললেন—“আমাকে আমার উত্তরাধিকার দিন।”

জাগতিক সিংহাসন নয়, স্বর্ণভাণ্ডার নয়—তিনি পেলেন অমর ধর্মধন।
সারিপুত্র থেরের মাধ্যমে তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করলেন।

একটি শিশু সেদিন রাজপুত্র থেকে হলেন ধর্মপুত্র।
পিতার সম্পদ মানে যে মুক্তির পথ—এ শিক্ষা বিশ্বকে দিয়ে গেলেন তিনি।
কিন্তু ভাবুন তো—এক মায়ের হৃদয় তখন কেমন ছিল?

 

মহাপ্রজাপতির সংকল্প—নারীর ইতিহাসে নতুন ভোর

এই পূর্ণিমাতেই মহাপ্রজাপতি গৌতমী গৃহত্যাগের সংকল্প নিলেন। যিনি শৈশব থেকে সিদ্ধার্থকে লালন করেছিলেন, তিনিও সংসার ত্যাগের পথে হাঁটলেন। এ ছিল কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়—এ ছিল নারী সংঘ প্রতিষ্ঠার সূচনা, আত্মমুক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার এক মহাকাব্যিক অধ্যায়।

মানবতার কাজ সম্পর্কে জানতে ঘুরে আসতে পারেন এই লিংকে- মানবতার আলোকবর্তিকা – সুবর্ণ থের

 

নন্দ ও আনন্দের প্রব্রজ্যা

ভগবানের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা নন্দ-এর প্রব্রজ্যা, যার অপূর্ব কাব্যিক বর্ণনা পাওয়া যায় অশ্বঘোষ-এর সৌন্দরানন্দ-এ—সেই ঘটনাও এই পূর্ণিমার স্মারক। আর ভগবানের অগ্রসেবক আনন্দ সহ বহু শাক্য কুমারের প্রব্রজ্যা—এ যেন এক রাজবংশের ধীরে ধীরে ধর্মবংশে রূপান্তর। রাজমুকুট খুলে তারা ধারণ করলেন চীবর—এ দৃশ্য ভাবলে আজও হৃদয় কেঁপে ওঠে।

 

পিতার অর্হৎ ফল লাভ

এই পবিত্র তিথিতে মহারাজ শুদ্ধোদন সদ্ধর্ম শ্রবণ করে “অর্হৎ ফল” লাভ করেন। এক পিতা, যিনি পুত্রকে হারিয়ে কেঁদেছিলেন, সেই পুত্রেরই বাণীতে চিরশান্তি পেলেন। এ যেন সংসারের সকল বিরহের এক মহামুক্তি।

 

 — ভদন্ত সুবর্ণ থের, অধ্যক্ষ- বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।

 

আমাদের হোমপেজ- এখানে ক্লিক করুন। 

 

On February 27, 2026 by Humanity in    No comments



বৌদ্ধ ধর্মের পঞ্চশীল – 

পঞ্চশীল শুধু নিয়ম নয়, এটি হৃদয়ের প্রতিশ্রুতি। প্রতিটি শীল আমাদের শেখায় কিভাবে জীবনকে স্পর্শ করা যায় দয়া, সততা এবং সত্যের আলো দিয়ে।

 ০১। প্রাণি হত্যা নিষিদ্ধ – অহিংসার গান

 প্রাণের প্রতি করুণা দেখাও। প্রতিটি প্রাণের হৃদয়ই পৃথিবীর বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়।” একটি পাখি, এক মাছ, এক খোলা মাঠের শূন্য ক্ষুদ্র প্রাণ—তাদের জীবনও আমাদের মতোই অমূল্য। তাদের প্রতি সহানুভূতি মানে আপনার হৃদয়কে বিশুদ্ধ করা। হিংসা যখন হারায়, শান্তি আসে; ক্ষতি যখন বন্ধ হয়, দয়া জন্মায়।

০২। চুরি না করা – সততার আলো

 অন্যের ধন কেড়ে নেওয়া মানে নিজের আত্মাকে অন্ধকারে ফেলা। সততা আমাদের জীবনের ভিত্তি। যখন আমরা অন্যকে বিশ্বাস করি, অন্যকে ক্ষতি করি না, তখন সম্পর্ক তৈরি হয় বিশ্বাসের গভীর সমুদ্রের মতো। একটি ছোট সততা, একটি সুন্দর হৃদয়ের প্রতিফলন।
 

০৩। অশ্লীলতা পরিহার – হৃদয়কে পরিচ্ছন্ন রাখা

 হৃদয়কে পরিষ্কার রাখো। সম্পর্ককে সম্মান দিয়ে বাঁচাও।”যৌনতা এবং কামনা প্রাকৃতিক, কিন্তু যখন তা অন্যকে আহত করে বা নিজের মানষিক শান্তি নষ্ট করে—সেটি অশ্লীলতা। নিজের মন ও আচরণকে শুদ্ধ রাখা মানে প্রেম ও সম্মানের শিক্ষা দেওয়া।

০৪। মিথ্যা বলা এড়ানো – সত্যের কণ্ঠ

 সত্য বলার সাহসই আপনার আত্মাকে মুক্ত করে।”মিথ্যা চিরস্থায়ী শান্তি আনে না। প্রতিটি মিথ্যা আমাদের অন্তরে অন্ধকার সৃষ্টি করে। সত্য বলার মাধ্যমে আমরা নিজেদের এবং অন্যদের মুক্তি দিই। সত্যের আলো ভেঙে দেয় ভয়, সন্দেহ ও বিভ্রান্তি।  

০৫। মাদক ও বিভ্রান্তিকর পদার্থ থেকে বিরত থাকা – সচেতন মন

 আপনার মনকে শুদ্ধ রাখুন, হৃদয়কে মুক্ত রাখুন। মদ বা অন্য বিভ্রান্তিকর পদার্থ আমাদের চিন্তাশক্তি নষ্ট করে, জীবনকে অন্ধকারে ফেলে। সচেতনতা ও স্বচ্ছ মন আমাদের দেখায় জীবনের সেরা পথ—শান্তি, প্রেম এবং জ্ঞানের আলো।

সারমর্ম

পঞ্চশীলের প্রতিটি শীল হলো হৃদয়বিদারক প্রতিজ্ঞা—নিজেকে এবং পৃথিবীর প্রতি দয়া, সততা, প্রেম ও সত্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিটি শীল পালন করা মানে শুধুই নিজের শান্তি নয়, আপনার চারপাশের সকল প্রাণকেও আলোকিত করা। একটি জীবন্ত পঞ্চশীল মনকে শান্তি দেয়, হৃদয়কে মুক্তি দেয় এবং জীবনকে সুন্দর করে তোলে।
 
ভদন্ত সুবর্ণ থের, পরিচালক - পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।

 

On February 21, 2026 by Humanity in    No comments

রক্তে রাঙানো একুশ: ভাষা শহীদদের প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধা

 

আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়—এটি আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের মায়ের ভাষার মর্যাদার প্রতীক।

১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকা-র রাজপথ রক্তে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের ভাষা শহীদরা। মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই আমরা আজ স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলি, লিখি, স্বপ্ন দেখি।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আজকের দিনটি সারা বিশ্বে পালিত হয়— এ আমাদের গর্ব, এ আমাদের অর্জন।

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভালোবাসা আর আত্মমর্যাদার প্রতিচ্ছবি। ভাষা শহীদদের আত্মদান আমাদের শিখিয়েছে—নিজের শিকড়কে ভালোবাসতে, নিজের ভাষাকে সম্মান করতে।

আজ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সকল ভাষা শহীদকে।
তাদের রক্তে রাঙানো এই বাংলা ভাষা যেন চিরদিন মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকে।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ভাষা শহীদদের প্রতি।
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? 🌺

 

— পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন, বাইন্যাছোলা, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি।  



On February 18, 2026 by Humanity in    No comments

 

ফাইল ছবি- বিশাখা

বিশাখা বৌদ্ধ ইতিহাসে বিশাখা একটি উজ্জ্বল আলো। তিনি কেবল গৌতম বুদ্ধের একজন প্রধান মহিলা উপাসিকা ছিলেন না, বরং স্নেহ, দয়া এবং অদম্য ভক্তির এক জীবন্ত প্রতীক। তাঁর দানশীলতা, ত্যাগ এবং পরোপকারের উদাহরণ যুগে যুগে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে। বিশাখার জীবন হলো এক ধারাবাহিক প্রেমের কাহিনি—শুধু ব্যক্তিগত ভক্তি নয়, বরং বৌদ্ধ ধর্মের প্রগতি, সামাজিক ন্যায় এবং মানবিক মূল্যবোধের উন্মেষ। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি দেখিয়েছেন, যে ভক্তি যখন সত্যিই নিঃস্বার্থ হয়, তখন তা শুধু আত্মার আলোকিত করে না, বরং চারপাশের পৃথিবীকেও উজ্জ্বল করে তোলে।

সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/অঙ্গুত্তর নিকায়- একক নিপাত/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa

 বিশাখার জন্ম ও জনপদের কথা—

বিশাখা জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রাচীন অঙ্গ জনপদের সমৃদ্ধ নগর ভদ্দিয়‑তে। ভদ্দিয় ছিল একটি জমে থাকা শহর, যেখানে উর্বর জমি, নদী ও বাণিজ্য সবই সমৃদ্ধ ছিল। এখানে ধনী পরিবার, ব্যবসায়ী ও শিক্ষিত মানুষরা থাকত। মানুষ ধর্ম এবং নৈতিকতা অনেক গুরুত্ব দিত, তাই নানা মত ও চিন্তার জন্য এখানে সব সময় খোলা পরিবেশ ছিল। পরে এই অঞ্চল শক্তিশালী মগধ রাজ্য‑এর অংশ হয়ে যায়।

এই সমৃদ্ধ ও নৈতিক পরিবেশেই ধনাঞ্জয় শ্রেষ্টী ঘরে জন্ম নেন বিশাখা। তাঁর পিতামহ মেণ্ডক ছিলেন দানশীল ও সম্মানিত ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকেই বিশাখা শিখেছিলেন সৎ জীবন, শিক্ষার গুরুত্ব এবং ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা—এগুলোই তাকে পরিণত করেছিল এক মৈত্রীপরায়ন, করুণাময়, প্রজ্ঞাবান এবং ভক্তিময় নারী হিসেবে।

সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/অঙ্গুত্তর নিকায়- একক নিপাত/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa

বুদ্ধের সঙ্গে প্রথম দেখা

বুদ্ধ ভদ্দিয় নগরে আগমন করলে তিনি পাঁচশত কুমারীসহ বুদ্ধকে অভ্যর্থনা জানান। বুদ্ধের ধর্মদেশনা শুনে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং স্রোতাপন্ন হন বলে অট্ঠকথায় উল্লেখ আছে। তখন মাত্র বিশাখার বয়স ৭ বছর। এত অল্প বয়সে তাঁর প্রজ্ঞা ও স্থিরতা সকলকে বিস্মিত করেছিল। এই ঘটনা থেকেই তাঁর জীবনের মূল দিক নির্ধারিত হয়—বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের প্রতি অটল শ্রদ্ধা।

সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa

বিবাহ ও “মিগারমাতা” উপাধি

যখন বিশাখা যৌবনে পা রাখেন, তাঁর জীবন নতুন মোড় নেয়। তিনি বিবাহিত হন পূর্ণবর্ধন নামে ধনী ও সৎ ও প্রজ্ঞাবান স্বামীর সঙ্গে। কিন্তু এই সংসারিক সুখ তাঁর ভক্তি ও কৃপার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাঁর স্বামীর পরিবারে প্রথমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কম ছিল; তাঁর শ্বশুর মিগার অন্য সম্প্রদায়ের অনুসারী ছিলেন।

বিশাখা তখনও ধৈর্য ও প্রজ্ঞার মূর্ত। প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি শান্ত, নম্র এবং নিষ্ঠাবান। তার দৃষ্টি, তার হৃদয়ই শেষমেষ তাঁর শ্বশুরকে বুদ্ধের শিষ্য হতে প্রভাবিত করে। মিগার শ্রেষ্টী তখন বলে ওঠেন“তোমাকে আমি মা ভাবি।” সেই ক্ষণেই বিশাখার নাম হয়ে যায় “মিগারমাতা”। শুধু শ্বশুরের জন্য নয়, পুরো ধর্মের জন্য এক মমতাময়ী আস্থার প্রতীক। 

এখানেই বোঝা যায়, সত্যিকারের ভক্তি কখনোই অহংকার বা আকাঙ্ক্ষার নয়। বিশাখার ভালোবাসা, ধৈর্য এবং অন্তরের স্থিরতা এক জীবন্ত পাঠ—যে ভক্তি শুধু আত্মাকে নয়, চারপাশের জীবনকেও আলোকিত করে।

সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa

পুব্বারাম বিহার নির্মাণ— 

বিশাখার দানশীলতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো “পুব্বারাম” বা “মিগারমাতুপাসাদ” বিহার নির্মাণ। তিনি বিপুল অর্থ ব্যয়ে এই বিহার নির্মাণ করে বুদ্ধ ও সংঘকে দান করেন। বুদ্ধ বহু বর্ষাবাস এখানে অতিবাহিত করেন। এই বিহার শুধু ধর্মীয় উপাসনার স্থান নয়, বরং শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/অঙ্গুত্তর নিকায়- একক নিপাত/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa

অষ্ট বর প্রার্থনা— 

বিশাখার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো বুদ্ধের নিকট আটটি বর প্রার্থনা। তিনি ব্যক্তিগত সুখের জন্য কিছু চাননি; বরং সংঘের সেবার সুযোগ চেয়েছিলেন। তাঁর প্রার্থনাগুলোর মধ্যে ছিল—

১. বর্ষাবাস বস্ত্র দান
২. আগন্তুক ভিক্ষুদের আহার
৩. গমনকারী ভিক্ষুদের আহার
৪. অসুস্থ ভিক্ষুদের খাদ্য
৫. সেবাকারীদের খাদ্য
৬. ওষুধ প্রদান
৭. প্রতিদিন ভিক্ষুদের পায়েস
৮. ভিক্ষুণীদের স্নানবস্ত্র

বুদ্ধ তাঁর এই প্রার্থনা অনুমোদন করেন এবং এর প্রশংসা করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে তাঁর ভক্তি ছিল সেবামূলক ও বাস্তবধর্মী।

সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/অঙ্গুত্তর নিকায়- একক নিপাত/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa

পারিবারিক জীবন— 

বিশাখা সংসারজীবন ত্যাগ করেননি। তাঁর দশ পুত্র ও দশ কন্যা ছিল। অসংখ্য নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর পরিবার ছিল বিশাল। তবুও তিনি সংসার ও ধর্ম—উভয় ক্ষেত্রেই সুষম জীবনযাপন করতেন। তিনি দেখিয়েছেন, গৃহস্থ জীবনেও উচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থান সম্ভব।

সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা–Visākhā Vatthu/ মনোরথপূরণী-Author: Buddhaghosa

জীবনের শেষ সময়— 

বিশাখা দীর্ঘায়ু লাভ করেন এবং বুদ্ধের শিষ্যত্বে জীবন অতিবাহিত করেন। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি স্রোতাপন্ন (Sotāpanna) অবস্থায় ছিলেন, অর্থাৎ ধর্মের ভিত্তি ও সত্যের পথে অটল। তাঁর প্রতিটি কাজ—দান, সেবা, ভক্তি—সদা অন্যদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ছিল। মৃত্যুর পর তিনি শুভ গতি লাভ করেন এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যে তিনি একজন শ্রেষ্ঠ দাত্রী ও ভক্তা নারী হিসেবে স্মরণীয়। 

সূত্র- ধম্মপদ অট্ঠকথা – Visākhā Vatthu / অঙ্গুত্তর নিকায় – Etadagga Vagga। 

 

 —  ভদন্ত সুবর্ণ থের, অধ্যক্ষ- বাইন্যাছোলা মৈত্রী বুদ্ধ বিহার, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি। 

 

মাননীয় এমপি দীপেন দেওয়ান মহোদয়
 

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পাহাড়ি জনপদ রাঙ্গামাটি শুধু পর্যটনের জন্য নয়, নেতৃত্বের জন্যও সুপরিচিত। এই অঞ্চল থেকেই উঠে এসেছেন একজন প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ, সংগঠক ও আইনজীবী — দীপেন দেওয়ান। পাহাড়ের মানুষের অধিকার, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী পথচলা আজও অনুপ্রেরণার উৎস।

 

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

দীপেন দেওয়ান জন্মগ্রহণ করেন ৮ জুন ১৯৬৩ সালে, রাঙ্গামাটিতে। তিনি একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুবিমল দেওয়ান জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত ছিলেন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর আদিবাসী বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই দীপেন দেওয়ান রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। চাকমা সম্প্রদায়ভুক্ত এই নেতা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সবসময় সোচ্চার ছিলেন।

 

শিক্ষা জীবন ও পেশাগত সূচনা

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা রাঙ্গামাটিতেই সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাড়ি জমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন মেধাবী ও নেতৃত্বগুণে সমৃদ্ধ। পড়াশোনা শেষে তিনি আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। আদালতে আইনচর্চার পাশাপাশি সমাজ ও মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি রাজনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন।

 

রাজনৈতিক অঙ্গনে পদার্পণ

দীপেন দেওয়ান জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর মাধ্যমে। দলীয় রাজনীতিতে তিনি দ্রুতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, বক্তব্য প্রদানের ক্ষমতা এবং পাহাড়ি অঞ্চলের বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা তাঁকে আলাদা করে তোলে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি সহ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে থেকে তিনি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারের বিষয়ে কাজ করেন।

 

সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়া

রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক আসে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তিনি রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদের সদস্য হন। বর্তমানে তিনি জাতীয় সংসদ–এর একজন নির্বাচিত সদস্য (এমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি পার্বত্য অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন বলে আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন। 

 

মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন

দীপেন দেওয়ান বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়–এর পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে তাঁর কাজ পার্বত্য এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, শান্তি প্রক্রিয়া জোরদার করা এবং স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তাঁর নেতৃত্বে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করবেন বলে জনগণের বিশ্বাস।

 

উন্নয়ন ভাবনা ও দর্শন

দীপেন দেওয়ানের রাজনীতির মূল দর্শন হলো — “অধিকার, উন্নয়ন ও সম্প্রীতি।” তিনি বিশ্বাস করেন, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। তিনি পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে শিক্ষা ও যুবসমাজের ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ। তিনি মনে করেন, দক্ষ ও শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

 

একজন দূরদর্শী নেতার প্রতিচ্ছবি

দীপেন দেওয়ান শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। স্থানীয় সমস্যা জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা এবং কার্যকর সমাধানের চেষ্টা তাঁকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস ও আস্থা রাখি। পাহাড়ি অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাঁর ভূমিকা ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করে যাবেন- সেই সফলতা কামনা করি।

পরিশেষে উপাসক বাবু দীপেন দেওয়ান ও তার পরিবারের প্রতি পূণ্যদান করছি। তারা সকলে সুকী সুখী হোক, নীরোগ দীর্ঘায়ু জীবন লাভ করুক। 

 


ভদন্ত সুবর্ণ থের, পরিচালক- পূর্ণজ্যোতি শিশু সদন (অনাথ আশ্রম), বাইন্যাছোলা, লক্ষীছড়ি, খাগড়াছড়ি। 

 

Most Popular